হাসপাতালমুখী ভাবনার বাইরে প্রতিমন্ত্রী: বৈশ্বিক প্রযুক্তি বিনিয়োগে বাধা ও উত্তরণের রূপরেখা
ছবি: সংগৃহীত
০৭:১৩ পিএম | ২০ অক্টোবর, ২০২৬
"হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসার ব্যর্থতা। আর আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—আমি স্বাস্থ্যের প্রতিমন্ত্রী, কোনো হাসপাতালের প্রতিমন্ত্রী নই।"
কথাগুলো কোনো তাত্ত্বিক গবেষকের নয়; খোদ দেশের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতের।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (AmCham) আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এই রূঢ় ও স্পষ্ট আত্মোপলব্ধি তুলে ধরেন। তাঁর এই একটি বক্তব্য দীর্ঘদিনের গতানুগতিক স্বাস্থ্যভাবনাকে এক ধাক্কায় নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কারণ যুগ যুগ ধরে আমাদের স্বাস্থ্য খাত মানেই ছিল কেবল নতুন নতুন বহুতল ভবন, শয্যা সংখ্যা বাড়ানো আর কোটি টাকার ভারী যন্ত্র কেনার উন্মাদনা। অথচ প্রতিমন্ত্রী আঙুল দিয়ে দেখালেন আদি সত্যটি—মানুষ যখন হাসপাতালে শয্যাশায়ী হতে বাধ্য হয়, তখন স্পষ্টতই রোগ প্রতিরোধের প্রথম প্রতিরোধব্যূহ ভেঙে পড়েছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্বখ্যাত মেডটেক প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিকের সাবেক শীর্ষ কর্তার মুখেও প্রতিধ্বনিত হয়েছিল একই দর্শন। ১৭ কোটির এই দেশে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহের কোনো কমতি নেই। তবে সেই আগ্রহ বারবার মুখ থুবড়ে পড়ছে আমাদের পুরোনো আমলাতান্ত্রিক জালে। মার্কিন দূতাবাস ও আমেরিকান চেম্বার খুব স্পষ্ট করেই তাদের হতাশার কথা তুলে ধরেছে।
এক নিবন্ধন পেতেই ফাইল ঘুরপাক খায় বছরজুড়ে, অবিক্রীত বা ব্যবহৃত সামগ্রী ফেরত পাঠানোর (re-export) নিয়ম নেই, যন্ত্রপাতির ওপর উচ্চ শুল্কের বোঝা, আর আছে অস্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ। এমন প্রতিকূল পরিবেশে বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যেমন হাঁপিয়ে ওঠে, তেমনি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ছোট-মাঝারি বিদেশি স্টার্টআপগুলোর জন্য প্রবেশের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সহজ ও স্থিতিশীল নীতি না পেলে তারা অন্য দেশে চলে যাবে—এই সতর্কবার্তাও এসেছে খোলামেলাভাবেই।
এই বাস্তবতায় শুধু আমদানি আর কেনাকাটার মোহ ত্যাগ করাও জরুরি। দেশে আনা দামি যন্ত্রপাতির সার্বিক জীবনকালীন ব্যয় (Total Cost of Ownership), খুচরা যন্ত্রাংশের নিশ্চয়তা এবং দেশেই মেরামতের মতো দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি ছাড়া কোনো সংস্কার টিকবে না।
আশার কথা, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড মুহিত সমস্যার শিকড়টি ধরতে পেরেছেন। তিনি কেবল সংকট স্বীকার করেই ক্ষান্ত হননি, দিয়েছেন দিকবদলকারী প্রতিশ্রুতির বার্তা। ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগের চিকিৎসাকে ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া, তৃণমূলের এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মীকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও আইওটি (IoT) ডিভাইসে সজ্জিত করা এবং যন্ত্রপাতির রিয়েল-টাইম তদারকির জন্য ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালুর উদ্যোগ সত্যিই যুগান্তকারী।

তবে এই রূপান্তরকে বাস্তবে রূপ দিতে বিদেশি প্রযুক্তির যে অবাধ প্রবাহ দরকার, তার পথে প্রধান বাধা আমাদের দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণমূলক জটিলতা। গোলটেবিলে আমেরিকান বিনিয়োগকারী ও আমচ্যামের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কিছু প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরা হয়েছে:
জটিল ও ধীরগতির নিবন্ধন: একটি মেডিকেল ডিভাইসের নিবন্ধন পেতেই ১০ থেকে ১২ মাস সময় লেগে যায় এবং একই প্রস্তুতকারকের একাধিক ফাইলের সমান্তরাল মূল্যায়ন হয় না।
অস্পষ্ট নীতিমালা ও উচ্চ শুল্ক: ওষুধ ও ডিভাইসের আমদানি নীতিমালা আলাদা না থাকা, যন্ত্র ও খুচরা যন্ত্রাংশের ওপর প্রায় ৩৯% পর্যন্ত চড়া আমদানি শুল্কের বোঝা এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে (MRP) ভ্যাট সমন্বয়হীনতা।
পণ্য ফেরত ও মেরামতের বাধা: অবিক্রীত বা মেরামতের প্রয়োজন এমন সামগ্রী বিদেশে ফেরত পাঠানো (re-export) এবং পুরোনো যন্ত্রাংশ আমদানিতে স্পষ্ট বিধান না থাকা।
এর বিপরীতে মার্কিন প্রতিনিধিদের সমাধান প্রস্তাবও ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট:
ডিভাইস-নির্দিষ্ট সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন: ওষুধ আইন থেকে আলাদা করে মেডিকেল ডিভাইসের জন্য নিজস্ব সময়াবদ্ধ ও আধুনিক ডিজিডিএ নীতিমালা প্রণয়ন।
সহনশীল শুল্ক ও স্বচ্ছ মূল্যনীতি: ডিভাইসের ধরনভেদে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক করা এবং ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত করে পূর্বাভাসযোগ্য এমআরপি নির্ধারণ।
সহজ মেরামত ও ছাড়করণ: ত্রুটিপূর্ণ পণ্য মেরামতে রি-এক্সপোর্টের সহজ পথ তৈরি করা এবং লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে আইটি খাতের মতো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখা।
সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অংশীদারিত্ব: নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের উন্নত প্রযুক্তির ওপর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ছোট-মাঝারি উদ্ভাবনী মার্কিন মেডটেক কোম্পানিগুলোর জন্য বাজারের দ্বার উন্মুক্ত করা।